ফ্রিম্যাসন (Freemasonry) কী? গোপন এই সংগঠনের ইতিহাস ও আসল উদ্দেশ্য

ফ্রিম্যাসনরি কী? তাদের গোপন রীতিনীতি, প্রতীক এবং বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। এটি কি কোনো ধর্ম নাকি স্রেফ ভ্রাতৃত্ব?

 ফ্রিম্যাসন (Freemasonry) কী? গোপন এই সংগঠনের ইতিহাস ও আসল উদ্দেশ্য

ফ্রিম্যাসন (Freemasonry): ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় ভ্রাতৃত্বের আদ্যোপান্ত

​পৃথিবীতে এমন কিছু নাম আছে যা শুনলেই মানুষের মনে রহস্যের জন্ম দেয়। 'ফ্রিম্যাসন' তেমনি একটি নাম। কেউ মনে করেন এটি একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন, আবার কেউ মনে করেন এটি পর্দার আড়াল থেকে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী কোনো অশুভ শক্তি। শত শত বছর ধরে টিকে থাকা এই সংগঠনটি আসলে কী এবং তারা কী করে, তা নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত আলোচনা।

১. ফ্রিম্যাসনরি কী এবং এর উৎপত্তি কোথায়?

​'ফ্রিম্যাসন' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে মধ্যযুগীয় 'স্টোন ম্যাসন' বা পাথর খোদাইকারী রাজমিস্ত্রিদের কাছ থেকে। যারা বড় বড় গির্জা বা ক্যাসেল তৈরি করতেন, তারা নিজেদের কাজের গোপন কৌশল রক্ষার জন্য এই গিল্ড বা সমিতি তৈরি করেছিলেন।

  • আধুনিক ফ্রিম্যাসনরি: ১৭১৭ সালে লন্ডনে চারটি 'লজ' (Lodge) একত্রিত হয়ে গ্র্যান্ড লজ গঠনের মাধ্যমে আধুনিক ফ্রিম্যাসনরির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
  • সদস্য কারা: ইতিহাসের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি যেমন জর্জ ওয়াশিংটন, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, উইনস্টন চার্চিল এবং আইজ্যাক নিউটন ফ্রিম্যাসন ছিলেন বলে জানা যায়।

২. ফ্রিম্যাসনদের কাজ ও রীতিনীতি

​ফ্রিম্যাসনরা দাবি করে তারা মূলত মানুষের চরিত্র গঠন এবং ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির কাজ করে। তাদের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:

  • লজ (Lodge): ফ্রিম্যাসনদের মিলনস্থলকে বলা হয় লজ। প্রতিটি লজের নিজস্ব রীতিনীতি ও গোপনীয়তা থাকে।
  • ডিগ্রি বা ধাপ: একজন সদস্যকে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেতে হয়। মূল তিনটি ধাপ হলো— এন্টারড অ্যাপ্রেন্টিস, ফেলো ক্রাফট এবং মাস্টার ম্যাসন
  • গোপন সংকেত: তারা একে অপরকে চেনার জন্য বিশেষ ধরণের করমর্দন (Handshake) এবং সংকেত ব্যবহার করে।

৩. প্রধান প্রতীকসমূহ

​ফ্রিম্যাসনদের সব প্রতীকই রাজমিস্ত্রিদের যন্ত্রপাতির সাথে সম্পর্কিত:

  • কম্পাস ও স্কয়ার (Square and Compasses): এটি তাদের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। এটি দিয়ে নৈতিকতা ও আচরণের সীমানা বোঝানো হয়।
  • 'G' অক্ষর: কম্পাস ও স্কয়ারের মাঝে 'G' অক্ষরটি থাকে, যা দিয়ে সাধারণত 'God' (ঈশ্বর) বা 'Geometry' (জ্যামিতি) বোঝানো হয়।

৪. ফ্রিম্যাসনরি কি কোনো ধর্ম?

​ফ্রিম্যাসনরা সরাসরি কোনো ধর্ম পালন করে না, তবে তারা নাস্তিকতা সমর্থন করে না। তাদের সদস্য হতে হলে অবশ্যই 'একজন উচ্চতর শক্তিতে' (Supreme Being) বিশ্বাস রাখতে হয়। এখানে সব ধর্মের মানুষের প্রবেশের অধিকার থাকলেও লজের ভেতরে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আলোচনা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৫. বিতর্ক ও ইসলামের দৃষ্টিতে ফ্রিম্যাসনরি

​ইলুমিনাতির মতো ফ্রিম্যাসনরি নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইসলামি স্কলারদের মতে:

  • ইহুদি সংশ্লিষ্টতা: অনেক গবেষক মনে করেন ফ্রিম্যাসনরির মূল লক্ষ্য হলো জেরুজালেমে 'হযরত সুলাইমান (আ.)-এর হাইকল' বা 'টেম্পল অফ সলোমন' পুনর্নির্মাণ করা। একে জায়নবাদী আন্দোলনের একটি গোপন অংশ হিসেবে অনেকে দেখেন।
  • গোপনীয়তা ও শিরক: তাদের রীতিনীতিতে এমন কিছু প্রতীকী পূজা বা শপথ রয়েছে যা ইসলামের তাওহীদ বা একত্ববাদের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হয়।
  • ফতোয়া: ১৯৮৭ সালে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং মক্কার ফিকহ একাডেমি ফ্রিম্যাসনরিকে ইসলাম বিরোধী এবং ক্ষতিকর সংগঠন হিসেবে ফতোয়া জারি করেছে।

৬. উপসংহার

​ফ্রিম্যাসনরা নিজেদেরকে 'একটি সুন্দর সমাজ গড়ার কারিগর' হিসেবে দাবি করলেও তাদের অতিরিক্ত গোপনীয়তা এবং পর্দার আড়ালের কর্মকাণ্ড সবসময়ই সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক যুগে তারা অনেক দাতব্য কাজ করলেও তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় এজেন্ডা নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

FAQ (প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী)

প্রশ্ন ১: ফ্রিম্যাসনরা কি শয়তানের পূজা করে?

উত্তর: তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এটি অস্বীকার করে। তবে লুইসিফার বা বিশেষ কিছু প্রতীকী পূজা নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক বিতর্কিত দাবি করেছেন।

প্রশ্ন ২: সাধারণ মানুষ কি ফ্রিম্যাসন হতে পারে?

উত্তর: ফ্রিম্যাসনরা কাউকে দাওয়াত দেয় না। কেউ যদি সদস্য হতে চায়, তবে তাকে লজের কোনো বর্তমান সদস্যের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।

About the author

Amdad
আমি একজন শিক্ষার্থী এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, যিনি পড়াশোনা ও আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে প্রযুক্তি অন্বেষণ করতে ও অর্জিত জ্ঞান ভাগ করে নিতে ভালোবাসেন।

Post a Comment

কমেন্ট করতে Enter Comment ক্লিক করুন।

Join the conversation