হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা এক সময় বিশ্বজুড়ে শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। যদিও বর্তমান সময়ে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও টিকার কারণে এর প্রকোপ অনেক কমেছে, তবুও সামান্য অসাবধানতায় এটি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠছে, তাই হাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রত্যেক মা-বাবার জন্য অপরিহার্য।
১. হাম কেন হয়? (Causes of Measles)
হাম মূলত 'প্যারামিক্সোভাইরাস' (Paramyxovirus) পরিবারের একটি ভাইরাসের কারণে হয়। এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ।
- সংক্রমণের মাধ্যম: আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কথা বলে, হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন বাতাসের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে বা তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার করলেও সুস্থ ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে।
- ঝুঁকির মাত্রা: এটি এতটাই ছোঁয়াচে যে, কোনো স্থানে হামের রোগী থাকলে তার আশেপাশে থাকা অনাক্রম্য (যাদের টিকা নেওয়া নেই) ব্যক্তিদের মধ্যে ৯০% মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২. হামের প্রধান লক্ষণসমূহ (Symptoms)
ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। একে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:
প্রাথমিক পর্যায়:
- তীব্র জ্বর (১০৩° থেকে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে)।
- শুকনো কাশি এবং নাক দিয়ে পানি পড়া।
- চোখ লাল হওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া (Conjunctivitis)।
- গলা ব্যথা।
কোপলিক স্পট (Koplik's Spots):
- হামের র্যাশ ওঠার ২-৩ দিন আগে গালের ভেতরের দিকে বা মাড়িতে ছোট ছোট সাদাটে দানা দেখা যায়, যা লবণের দানার মতো মনে হয়। এটি হাম শনাক্ত করার একটি বড় উপায়।
র্যাশ বা ফুসকুড়ি পর্যায়:
- জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৫ দিন পর শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। এটি সাধারণত মুখমণ্ডল ও কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. হামের জটিলতা (Complications)
হাম সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে কিছু মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে:
- নিউমোনিয়া: হামের কারণে ফুসফুসে সংক্রমণ হতে পারে, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
- ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা: শরীর দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
- এনসেফালাইটিস: মস্তিষ্কে প্রদাহ হতে পারে, যা স্থায়ী বিকলাঙ্গতা তৈরি করতে পারে।
- অন্ধত্ব: ভিটামিন এ-র অভাব হলে শিশুর চোখের ক্ষতি হতে পারে।
৪. প্রতিকার ও ঘরোয়া যত্ন (Treatment & Care)
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টি-ভাইরাল ঔষধ নেই। সাধারণত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজে থেকেই ভাইরাসটিকে ধ্বংস করে। তবে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- বিশ্রাম: রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে দিন এবং আলাদা ঘরে রাখুন যাতে অন্যদের মধ্যে না ছড়ায়।
- ভিটামিন এ (Vitamin A): হাম হলে শরীরে ভিটামিন এ-র অভাব দেখা দেয়, যা অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়ায়। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন এ ক্যাপসুল সেবন করান।
- পর্যাপ্ত তরল: জ্বর ও র্যাশের কারণে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাই প্রচুর পানি, ডাবের পানি, স্যুপ এবং ফলের রস খাওয়ান।
- জ্বর নিয়ন্ত্রণ: জ্বর কমাতে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিন। গা মোছানোর জন্য কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।
- চোখ ও মুখের যত্ন: পরিষ্কার তুলা বা নরম কাপড় দিয়ে মাঝেমধ্যে চোখ ও নাক পরিষ্কার করে দিন।
৫. হাম প্রতিরোধে টিকার গুরুত্ব (Prevention)
হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং শ্রেষ্ঠ উপায় হলো টিকা (Vaccination)।
- এমআর (MR) টিকা: বাংলাদেশে সরকারিভাবে ৯ মাস পূর্ণ হলে ১ম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে ২য় ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয়।
- সুরক্ষা: এই টিকা শিশুকে হাম ও রুবেলা থেকে আজীবন সুরক্ষা প্রদান করে। মনে রাখবেন, হাম আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে টিকা নেওয়া হাজার গুণ সহজ ও নিরাপদ।
৬. সাবধানতা
- আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৭-১০ দিন স্কুল বা অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখুন।
- পরিবারের সবার হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করুন।
- র্যাশ বা ফুসকুড়িতে কোনো ধরণের পাউডার বা মলম ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া লাগাবেন না।
৭. উপসংহার
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে টিকা দান এবং আক্রান্ত অবস্থায় সঠিক যত্ন নিলে খুব সহজেই এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন থাকুন এবং কোনো ধরণের জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
